প্রশ্নফাঁস এবং এক কাপ চা

[সাধু ভাষায় এটাই আমার প্রথম রচনা। রম্যের আড়ালে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক সমস্যা নিয়ে লিখার চেষ্টা করেছি। পড়ে ভাল লাগবে আশা করি ]

প্রশ্নফাঁস এবং এক কাপ চা
– মুহাম্মদ হাসানুল বান্না সিয়াম

সুন্দর শুভ্র সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার ফাঁকেই প্রিয় ফোনাখানা হাতে লইয়া বাবার প্রিয় আর্মচেয়ার গিয়া বসিলাম। চেয়ারখানা বাবার প্রিয় বলিবার কারণ, বহুবৎসর গত হইয়া গেলেও এখনো তিনি ইহার মায়া ছাড়িতে পারেন নাই। আর ফোনখানা বড় ভাইজানের উপহার। আগেরটা অকস্মাৎ নষ্ট হইয়া যাইবার পর আমি যখন দুঃখ শোকে পাথর, তখনি ভাইজান তাড়াহুড়ো করিয়া শান্তির বার্তাস্বরূপ ইহা পাঠাইয়া দিলেন। ফোন নষ্ট হইবার ঘটনা হইতে প্রাপ্ত শিক্ষার ফলাফল হইল, নতুনটার যত্নের কোনরূপ কমতি হইতেছে না।

যাহাহউক, যে কথা বলিতেছিলাম। ফোন হাতে লইবার উদ্দেশ্য, বদনগ্রন্থতে ঢু মারিব। যথাসম্ভব ইমেইল আর পাসওয়ার্ড নির্দিষ্টস্থানে পূরণ করিয়া বদনগ্রন্থের সংবাদভোজনে উপস্থিত হইলাম।

স্ক্রোল করিয়া কিছুদূর যাইতেই চক্ষু ছানাবড়া অবস্থা! প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত খবরাখবর লইয়া চারিদিক তোলপাড় হইয়া যাইতেছে। তর্ক-বিতর্ক আর কাদা ছোড়াছোড়িও কম হইতেছে না।

শ্রদ্ধেয় ‘নীল ভিট্রিয়ল’ ভাইসহ, ছোট-মাঝারি এবং লম্বা ভাইয়েরাও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে তুমুলভাবে সোচ্চার হইয়া উঠিয়াছেন। ওদিকে নির্যাতিত ফোরটিন ব্যাচের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কোনরূপ তাল-বেতাল ঠাহর করিতে না পারিয়া, দিশা হারাইয়া আশে পাশের সকল স্থানেই কাদা ছুড়িয়া রাগ দমাইবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাইতে লাগিল। কোনরকমে ছানাবড়া হওয়া চক্ষু সামলাইয়া আরো কিছুদুর স্ক্রোল করিতেই দেখিতে পাইলাম বিশিষ্ট বলগারদিগকের মতামত। টানিয়া-হিচড়াইয়া ঘটনাকে যতদিক প্রবাহিত করা সম্ভব, তার সবকয়টাই ইতঃমধ্যে সম্পন্ন হইয়াছে। কিন্তু, এইসব তর্ক-বিতর্ক আর জ্ঞানগর্ভ পোষ্ট পড়িয়া যেটুকু বুঝিলাম যে, এতে কাজের কাজ কিছুই হইয়া ওঠে নাই। অধিকন্তু এই চুলছেড়া বিশ্লেষণের যাতাকলে পড়িয়া কিছু মৌলিক বিষয় চাপা রইয়া গিয়াছে।

প্রশ্ন ফাঁসের ইতিহাস আমাদের অনেক সমৃদ্ধ এবং গৌরবের বিষয়ও বটে। তবে তা সরাসরি প্রশ্ন আকারে না হইলেও শর্ট সাজেশন আকারেই অধিক জনপ্রিয় হইয়া আসিয়াছে। এই জিনিস এইবার আসিয়াছে তাই আগামীবার আসিবে না, একথা কার-ই বা অজানা। ১৫টা প্রশ্ন পড়িলে তার ১০টাই কমন পড়িবে এমন শর্ট সাজেশন দেওয়া এবং নেওয়া উভয়ই এইদেশে মস্তবড় ক্রেডিট হিসেবে গন্য হইয়া থাকে। যাহারা শর্ট সাজেশন দিয়া থাকেন, অভিভাবকদিগকের নিকট তাহারা জাতীয় বীরের চাইতে কোন অংশেই কম মর্যাদা পান না। তারপরেও, শর্ট সাজেশনের রীতি হইতে লম্ফ দিয়া সরাসরি সমগ্র দেশব্যাপী প্রশ্ন ফাঁস করিয়া দেওয়া, সত্য-ই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বটে।
ইহা যে বাস্তবিক অর্থেই বিভিন্ন রকম সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করিয়া দিয়াছে, তাহা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।

দিবালোকের মত স্পষ্ট প্রশ্নফাঁসের ঘটনাগুলি শ্রদ্ধেয় মন্ত্রীমশাই কেন শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকিবার মত আঁড়াল করিবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাইতেছেন তাহা আমার বোধগম্য নহে। টানাটানি করিয়া বিল্ডিং ধ্বসাইবার মত সুপার তত্ত্ব দিতে না পারিলেও, ইতঃমধ্যে তিনি যেইসব থিওরি জাতির সামনে উপস্থাপন করিয়াছেন, তা সকলের মত আমাকেও অভিভূত না করিয়া পারে না। এইসব থিওরী বাংলার একসময়কার পন্ডিত রাজা লটকন সেনের নিকট উপস্থাপন করা হইলে তিনি নিশ্চিত লজ্জা পাইয়া ফাঁসির আদেশই প্রদান করিতেন বলিয়া মনে করি।

শিক্ষাঙ্গণে যে বড় ধরণের বিশৃংখলা চলিতেছে, তাহা সকলের নিকট দিবালোকের মত পরিষ্কার হইলেও, একমাত্র বুঝি সেই দায়িত্ববান ব্যক্তির নিকটই তা এখনো স্পষ্ট হইয়া ওঠে নাই। জাতির মেরুদন্ড যাহারা শক্তিশালী করিবে, সেই শিক্ষক সমাজকেই যখন সর্বোচ্চ সম্মান এবং সম্মানী দেওয়ার কথা চিন্তা করিবার ফুরসুত কেহ পান না, তখন শিক্ষকের গদিতে দেশের সেরা ছাত্রদিগকে দেখিবার প্রত্যাশা অন্যায় নয় কি?

ক্লাসে আসিয়া গল্প করিয়া সময় কাটাইয়া দেওয়া কিংবা রাত্রের ঘুমের বাকি অংশ ক্লাসে পূর্ণ করিবার মত শিক্ষকের এদেশে অভাব নাই। ক্লাসে ভাল না পড়াইয়া ছাত্রছাত্রীদের নিজ বাসায় প্রাইভেট পড়াইবার জন্য জোর করিবার ঘটনা, আজকাল অহরহই ঘটিতেছে। নতুন সংস্করণ হিসাবে যুক্ত হইয়াছে নিজের লিখা বই পড়িতে শিক্ষার্থীদিগকে বাধ্য করিবার নতুন ফন্দি। কোন অভাগা ছাত্র যদি শিক্ষক মহাশয়ের ” সবাই কি আমার বই সংগ্রহ করেছ? ” প্রশ্নখানার জবাবে ভুল করিয়া “না” বলিয়া ফেলে, তবে তাহার পরীক্ষার খাতাটি যে শিক্ষকের কলম দ্বারা নির্দয় হত্যাকান্ডের শিকার হইবে, তাহা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নাই।

পাঠ্যপুস্তক বলিয়া নির্বাচিত এবং সম্পাদিত বইগুলির কতগুলো তাহাদের সঠিক মান বজায় রাখিতেছে এবং যুগের সহিত খাপ খাইবার কতখানি উপযোগী হইয়াছে, তাহা খতিয়ে দেখিবার বোধহয় কেহ নাই। সঠিক প্রস্তুতি ব্যতিরেকে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন করিয়া বিজ্ঞ সরকার ইহাকে এক অর্থে ব্যাঙের ছাতার মত গজাইয়া উঠা কোচিং গুলোর জন্যই আশির্বাদ বানাইয়া দিয়াছেন।

গদবাধা মুখস্ত অভ্যাসকে বিদায় জানাইবার জন্য সৃজনশীলের মত চমৎকার পদ্ধতির বিরোধিতা আমি করি না, তবে এইরকম উন্নত মানের পদ্ধতি প্রণয়ন করিবার আগে, এই মান বজায় রাখিবার মত মান আমাদের আছে কিনা, তাহা সম্পর্কে সরকার খুব বেশি ভাবিছেন বলিয়া মনে হয় না। ফলশ্রুতিতে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় ট্রেনিং না পাইয়া, না পারিতেছেন সঠিক উপায়ে সৃজনশীল প্রশ্ন তৈয়ার করিতে, আর না পারিতেছেন ক্লাসে সঠিক উপায়ে পাঠদান করিতে। কেহ কেহ তো নতুন বইয়ের সহিত যুত করিতে না পারিয়া, অবশেষে বুদ্ধি করিয়া পুরনো বই কিংবা গাইড হইতে প্রশ্ন তুলিয়া দিয়া নিজের বিদ্যা জাহির করিবার অপচেষ্টাও চালাইতেছেন।

লও এইবার ঠেলা সামলাও! যেই গাইড বন্ধ করিবার জন্য এতসব ফন্দি, সেই গাইড মশাই এখন শিক্ষকের ক্লোজ ফ্রেন্ড বনিয়া গিয়াছে। নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ গাইড হইতে চোখ বন্ধ করিয়া প্রশ্ন তুলিয়া দিতেছে, সেইখানে গ্রাম-গঞ্জের কথা আর না বলাই শ্রেয়। অধিকন্তু আজকাল নাকি বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নেও গাইড মশাই এর অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যাইতেছে।

শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নে যাইতেছে কিনা সেই বিতর্কে যাইতে চাহি না, কিন্তু উর্দ্ধে যে উঠিতেছেনা সে কথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। এক বড় ভাই সত্যই বলিয়াছেন, শিক্ষার বর্তমান যেই অবস্থা, তাহাতে অদূর ভবিষ্যতে আমরা কিছু দক্ষ শ্রমিক পাইব বটে, কিন্তু এইখান হইতে কোন বিজ্ঞানী কিংবা গবেষক বাহির হইয়া আসিবে না। প্রভু সদৃশ দাদা-নানাদের ভৃত্য হইয়াই বাঙ্গালীর চিরকাল কাটিবে, ভাগ্যের চাকা আর বদলাইবে না।

যেই জাতির শিক্ষার মান-ই ঠিক নাই, সেই জাতির মধ্য হইতে আদর্শ, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব আশা করাও পাপ। আর যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দেশ যে অপরের হাতের পুতুল হইয়া থাকিবে, তা চোখ বন্ধ করিয়াই বলিয়া দেওয়া যায়। বড় বড় রুই-কাতলারা দুর্নীতি করিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অর্জন ও গৌরবের মুখে যেইভাবে চুনকালি মাখিয়া পদে পদে দেশকে রসাতলে লইয়া যাইতেছেন, সেই কথা বুঝিবার, উপলব্ধি করিবার এবং প্রতিবাদ করিবার মত মানুষের সংখ্যা এইদেশে একশজনেও একজন পাওয়া কঠিন। দেশকে শিক্ষা, সমৃদ্ধি ও উন্নতির দিকে আগাইবার যে দৃঢ় প্রত্যয় লইয়া স্বাধীনতার রক্তিম লাল সূর্য বাংলার আকাশে উদিত হইয়াছিল, একটা শক্তিশালী উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে, যোগ্য লোক তৈরীর অভাবে সে স্বপ্নও দিন দিন ধুলিস্মাত হইয়া যাইতেছে।

আর যেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই করুণ দশা, সেইখানে প্রশ্ন ফাঁস হওয়া বা না হওয়া আসলেই কতটুকু পার্থক্য গড়িয়া দিতে পারে সে কথাই ভাবিতেছিলাম। তবে আশার বানী একটাই যে, যদিও বিশ্বের সেরা ভার্সিটি গুলির মধ্যে যায়গা করিয়া লওয়ার যোগ্যতা আমাদের ভার্সিটিগুলোর নাই, তথাপি মোটামুটি স্বচ্ছ মানের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে এইখানে। সেই হিসেবে দিন শেষে ভাল-খারাপ এর একটা ফয়সালা হইয়াই যায়। এতকিছুর পরেও চক্ষু লজ্জা বলিয়া তো একটা কথা আছে, সেই কারণেই প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ দেখিতে চাই। তবে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করিবার জন্য বদনগ্রন্থ কিংবা কিচিরমিচির বন্ধের বুদ্ধিটা কোনভাবেই সমর্থন করিতে পারিলাম না।

মন্ত্রী মশাই কি জানেন না, একদিন বদনগ্রন্থে ঢুকিতে না পারিলে কিংবা কিচিরমিচিরে যেয়ে কেচ-কেচ না করিতে পারিলে বহু পোলাপান এর পেটের ভাত হজম হইবে না। অধিকন্তু, নানান পরীক্ষার দরূণ দীর্ঘ ৫ মাস এই সামাজিক গোগাগোগ রক্ষার সাইট গুলি বন্ধ করিয়া দিলে বদ হজমের রোগী দিয়া হাসপাতাল ভরিয়া যাইবার উপক্রম হইতে পারে।

সে যা-ই হোক, প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হইলে সাংবাদিকবন্ধুগণের লিখা-লিখির একটা টপিক কমিবে বটে, শিক্ষার আসল উন্নতি হইবে কি??

সেই প্রশ্নই জাতির বিবেকের কাছে রাখিয়া আমি আবার চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।
কিন্তু হায় হায়! আমার চা তো ঠান্ডা হইয়া গিয়াছে!!
একি করিলাম আমি!! প্রশ্নফাঁস লইয়া প্যাচাল পারিতে গিয়া আমার চা-খানা ঠান্ডা বানাইয়া ফেলিলাম!!
নাহ, কাজটা মোটেই উচিত হইল না।

এইবার এই চা গরম করিতে গেলে নিশ্চিত আম্মাজানের কাছে দুই ডোজ বকা শুনিতে হইবে, এর চাহিতে ভাল ঠান্ডা চা-ই গলাধঃকরণ করিয়া ফেলি। আমার অবস্থা শুনিয়া হাসিয়া কুট কুট হইয়া গেলে তাহাদের উদ্দেশ্যে বলি, প্রশ্নফাঁসের সুদূর প্রভাব যে আমার চায়ের কাপেও আসিয়া পড়িবে তাহা কিন্তু আমি বুঝিতে পারি নাই। 😀

[কতিপয় শব্দার্থ: বদনগ্রন্থ= Facebook, কিচিরমিচির= Twitter, সংবাদভোজন= Newsfeed, গোগাগোগ= যোগাযোগ, লটকন = লক্ষণ, কেচ কেচ = Tweet ]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s